• ক্যাম্পাস

    বৃত্তের বাদামী খামে, চিঠি দিও প্রিয়জনের নামে

      প্রতিনিধি ১৭ নভেম্বর ২০২২ , ৫:৩৪:৩৮ প্রিন্ট সংস্করণ

    ফারজানা রহমান সম্পা:

    চিঠি, আগে ছিলো যোগাযোগ ও ভাব বিনিময়ের সবচেয়ে বড় মাধ্যম ।তথ্য প্রযুক্তির যুগে এখন আর কাউকে চিঠি লিখতে দেখা যায় না।বাদামী খামে পাঠানো চিঠির মধ্যে লুকিয়ে থাকতো হাজারো আবেগ, অনুভূতি। প্রিয় জনের থেকে পাওয়া চিঠির অপেক্ষা যেন ছিলো আরও সপ্নের জাল বোনা। কি লিখবে সে চিঠিতে,আমার প্রতি জমানো অভিযোগ নাকি ভলোবাসা।তাই চিঠির জন্য ৭-৮ দিনের অপেক্ষা যেনো ছিলো কয়েকটা মুহূর্ত মাত্র।হোয়ট্স আ্যাপ, ফেসবুক, টুইটার এই যান্ত্রিকতার ভীরে চিঠির অস্তিত্ব ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যাচ্ছে।

    চিঠির কথা শুনলেই মনে পরে যায় নাটক -সিনেমায় একটা কমন ডায়ালগ, যেটা প্রায় শোনা যায়-দাদীর বলা একটি কথা,”জানো দাদুভাই, আমি  চিঠি লিখতাম তোমার দাদুর কাছে।চাকরি সুত্রে মানুষটা থাকতো অনেক দূরে। চিঠি লিখে তাই অপেক্ষায় থাকতাম কখন পোস্টমাস্টার এসে বলবে চিঠি এসেছে আপনার ঠিকানায়”।

    এখন আর চিঠির মাধ্যমে আবেগ প্রকাশের চিত্র দেখাই যায় না।এই চিঠি এখন হারানো অতীত মাত্র। এখন কেউ চিঠির কথা শুনলেই বলে উঠে,এই যুগে আবার কেউ চিঠি লিখে নাকি??

    হ্যাঁ, এই আধুনিকতার যুগে  কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যায়ের একমাত্র  গ্রাফিতিভিত্তিক সংগঠন  বৃত্ত কুবির প্রচেষ্টায় কাঁঠাল তলার কোল ঘেঁষেই একটি ময়লা দেয়াল রূপ নিয়েছে চিঠি চত্বরে।বৃত্ত কুবির প্রতিটি সদস্য রং তুলির আছড়ে নিজেদের মতো করে সাজিয়েছে দেয়ালটিকে।যেখানে গেলে দেখা যায়, বেনামি পত্র, মায়ের কাছে লেখা ছেলের চিঠি—“এই যান্ত্রিকতায় নিজেকে মানিয়ে নিতে পারছি না মা,দোয়া করিও”।বন্ধুর কাছে টাকা চেয়ে অন্য বন্ধুর চিঠি।

    কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের চিঠি চত্বরে গেলেই মনে পরে যায় একটি গান–“ভালো আছি ভালো থেকো,আাকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখো”। তবে আর আাকাশের ঠিকানায় নয়,চিঠি লিখো প্রিয় জনের ঠিকানায়।বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা  নিজেদের নাম, বিভাগ প্রকাশ করে চিঠি লিখতে পারবে প্রিয় জনের কাছে।চাইলে নাম প্রকাশ না করে ও চিঠি লেখা যাবে।বৃত্ত কুবির সদস্যরা সেই চিঠি পৌঁছে দেবে নির্দিষ্ট ঠিকানায়।

    মহাদেব সাহার সেই উক্তি-মেসেজ কেনো,আমি তোমার হাতে লেখা চিঠিখানা চাই, ভুল বানান,বাকা অক্ষর কিচ্ছু ক্ষতি নেই।চিঠি চত্ত্বরে গেলে এই লেখাটাই প্রথমে চোখে পরে।আসলেই ক্ষতি তো কিছু নেই।

    বৃত্ত কুবির করা ২৫-৩০ টি কাজের মধ্যে এটি ও একটি,যা কিনা সবাইকে কিছুক্ষনের জন্য হলে ও অতীতে নিয়ে যায়।চিঠি প্রদানের অভিনব এই পদ্ধতি সত্যিই প্রশংসার দাবিদার।চিঠি চত্বরকে একটি ডাকবাক্স উপহার দেন কুমিল্লা ডাক বিভাগ।২৭ সেপ্টেম্বর চিঠি চত্বরের ডাকবাক্সে চিঠি ফেলে উদ্বোধন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক  ড.এ এফ এম আবদুল মঈন।

    বৃত্তের চিঠি কার্যক্রম তিনভাবে পরিচালিত হয়।নামসহ চিঠি–যেখানে প্রেরক এবং প্রাপকের নাম উল্লেখ থাকবে।বেনামী চিঠি-এখানে শুধু প্রাপকের নাম উল্লেখ থাকবে।খোলা চিঠি- এই চিঠির ক্ষেত্রে কোন নিয়ম নেই। যার যেভাবে খুশি লিখতে পারবে।পরে এ চিঠিগুলো দিয়ে প্রদর্শনী করা হবে।

    চিঠি  চত্বরকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে ছবি তোলার ধুম।কেউ এখন বলে না-চিঠি দিও প্রিয়, অপেক্ষায় রইলাম।শুধু বিশ্ববিদ্যালয় না,এখানে ছবি তোলার জন্য আসে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাহিরে আরও অনেকে।মেয়েরা নানা রঙের শাড়ি পরে আসে ছবি তুলতে।

    তাদের মধ্যে ফারজানা লিলি নামের একজন বলেন–আমি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি না।এখানে বন্ধুদের সাথে ঘুরতে এসেছি।অনেক শুনেছি যে আগে চিঠির মাধ্যমে প্রেম নিবেদন করা হতো এবং বইতে ও পড়েছি কিন্তু আমি কখনো কারো জন্য লিখি নি।চিঠি চত্বরের মতো এই ধরনের চিন্তা এখন খুবই বিরল,আমার কাছে এই বিষয়টা ইউনিক লেগেছে।

    তাই হয়তো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর চিঠি সম্পর্কে বলেছেন– বাস্তবিক মানুষে মানুষে দেখাশুনার পরিচয় থেকে,চিঠির পরিচয় একটু স্বতন্ত্র।তার মধ্যে এক রকমের নিবিড়তা গভীরতা এক প্রকার বিশেষ আনন্দ  আছে।

    কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষার্থী–তাইমুন্নাহার তিশা, সাবিনা ইয়াসমিনের গাওয়া একটি গানের দুই লাইন–“চিঠি দিও প্রতি দিন, চিঠি দিও।থাকতে পারবো না,চিঠিগুলো অনেক বড় হবে,পড়তে পড়তে সকাল-দুপুর আর রাত্রি চলে যাবে”গেয়ে বলেন—আমাকে ও হয়তো কেউ চিঠি লিখবে এটা ভাবতেই অন্যরকম একটা ভালো লাগা কাজ করে।এটা নিয়ে সবার মধ্যেই একটা জল্পনা কল্পনা শুরু হয়েছে,তেমনি আমার ও।

    আগে চিঠির মাধ্যমে সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, ব্যাথা-বেদনা, রাগ -অনুরাগ,পাওয়া না পাওয়া, হৃদয়ের আকুতি জানিয়ে সাদা কাগজে ফুটে উঠতো আলাপন।বৃত্ত কুবির এই চত্বরের হাত ধরে আবার ও ফিরে  আসুক সেই চিঠি, এই প্রত্যাশাই করি। চিঠি দিও চত্বরে, অপেক্ষায় রইলাম।

    আরও খবর

                       

    জনপ্রিয় সংবাদ