ওয়ার্ড বয়ও ‘চিকিৎসক’, রোগীর অসহায়ত্ব ঘিরে কর্মচারীদের রমরমা ব্যবসা
- আপডেট সময় : ১০:০৪:১০ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ মার্চ ২০২৬
- / ৯৭০৩ বার পড়া হয়েছে
জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে দালালের দৌরাত্ম্য নিত্যদিনের। এ নিয়ে বেশ কয়েকবার সংবাদ প্রচার হয়েছে। দফায় দফায় সেনাবাহিনী, র্যাব, পুলিশের সহায়তা চেয়েও হয়নি সমাধান। দমানো যায়নি আশপাশের বেসরকারি ক্লিনিকের দালালদের। হৃদরোগ হাসপাতাল থেকে টিকিট কাটার পরও রোগীদের ভাগিয়ে নেওয়ার কাজ তারা করে চলছেন প্রকাশ্যেই।
বহিরাগত দালালদের নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার মধ্যেই পাওয়া গেছে অভ্যন্তরীণ দালাল চক্রের সন্ধান। হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগে কর্মচারীদের একটি সিন্ডিকেট রোগী ভাগানো, ওয়ার্ড বয় হয়েও চিকিৎসক সেজে চিকিৎসা দেওয়া, অতিরিক্ত ওষুধ ক্রয় করিয়ে এনে সেগুলো ফের বিক্রি করা, বেড দিতে টাকা নেওয়া, জোর করে বকশিশ আদায়সহ নানান অনিয়মে জড়িত। এসবের সুনির্দিষ্ট তথ্য, ছবি এবং ভিডিও রয়েছে বাংলাদেশের বার্তা’র কাছে।
হার্টের রিং পরানো রোগীদের শিট খোলার জন্য ৫০০ টাকা চাইছেন ওয়ার্ড বয় আলাউদ্দিন, রিং পরানো রোগীদের শিট খুলছেন ওয়ার্ড বয় মশিউর রহমান লাবলু এবং আলাউদ্দিন।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এসব অনিয়ম হয়ে আসছে হরহামেশাই। লেখালেখি হলে সাপলুডু খেলার মতো অভিযুক্তদের এক ওয়ার্ড থেকে আরেক ওয়ার্ডে স্থানান্তর করেই দায় সারানো হয়। কার্যত ভেতরে-বাইরে দালাল চক্রের দৌরাত্ম্যে অসহায় চিকিৎসক এবং তুলনামূলক সৎ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। সম্প্রতি একজন রোগীর সূত্র ধরে পুরো হাসপাতালের অনিয়মের চিত্র উঠে আসে বাংলাদেশের বার্তা’র প্রতিবেদকের কাছে।
এসব অনিয়ম হয়ে আসছে হরহামেশাই। লেখালেখি হলে সাপলুডু খেলার মতো অভিযুক্তদের এক ওয়ার্ড থেকে আরেক ওয়ার্ডে স্থানান্তর করেই দায় সারানো হয়। কার্যত ভেতরে-বাইরে দালাল চক্রের দৌরাত্ম্যে অসহায় চিকিৎসক এবং তুলনামূলক সৎ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
ঘটনাটি চলতি বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারির। সকাল সাড়ে ৭টা। মানিকগঞ্জ সদর হাসাপাতাল থেকে বাবা জিন্নাত আলীকে নিয়ে হৃদরোগ হাসপাতালে আসেন ছেলে আবু হুরায়রা। জরুরি বিভাগ থেকে ভর্তি দিয়ে পাঠায় সিসিইউতে। কিন্তু বাধ সাধলেন একজন স্টাফ। জরুরি পরীক্ষার কথা বলে আটকান তিনি। পরীক্ষা করে রোগীর অবস্থা খারাপ দেখিয়ে দ্রুত আইসিইউতে নিতে বলেন। স্বজনরাও চিকিৎসার প্রয়োজনে রাজি হন। স্টাফ নিজেই গাড়ি ঠিক করে পাঠিয়ে দেন পাশের এক বেসরকারি ক্লিনিকে। সেখানে অর্থকড়ি হাতিয়ে নিলেও কার্যত কোনো চিকিৎসা-ই হয়নি। বরং রোগীর অবস্থা আরও অবনতি হয়েছে। তাদের সঙ্গে হওয়া প্রতারণা বুঝতে পেরে প্রতিকার চাইতে গিয়ে মারধরের শিকার হয়েছেন স্বজনরা। এরপর অনেকটা লড়াই করে রোগী হৃদরোগ হাসপাতালে আনলে সেখানেই মারা যান।
রোগী ভাগিয়ে দেওয়া ওই স্টাফের খোঁজ এবং বিচার চাইতে গিয়ে হৃদরোগ হাসপাতালেও দফায় দফায় মারধরের শিকার হন পিতার হারানোর শোকে ন্যুব্জ আবু হুরায়রা।
এ ঘটনার সত্যতা যাচাই এবং নেপথ্যের চক্রের খোঁজে নামে বাংলাদেশের বার্তা। তিনদিনে হাসপাতালটির ডজনখানেক চিকিৎসক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীর সঙ্গে আলাপ করে নিয়মিত এমন ঘটনার তথ্য পাওয়া যায়। এখানে জরুরি বিভাগ, ক্যাথল্যাব, সিসিইউ-১, সিসিইউ-২ এ অসাধু পৃথক সিন্ডিকেটের সন্ধান মিলেছে। এরা রোগী ভাগানো, জিম্মি করে টাকা আদায় এবং ডাক্তার সেজে ওষুধ লিখে এনে পরে বিক্রি করে দেয়। এসব ঘটনা ভিডিও এবং স্থির চিত্রসহ সংগ্রহ করেছে বাংলাদেশের বার্তা ।
জরুরি বিভাগে থেকে সর্বত্র অপরাধী সিন্ডিকেট
অনুসন্ধানে জানা যায়, জরুরি বিভাগ থেকে শুরু হয় এই চক্রের কাজ। ওয়ার্ড বয় শহীদুল ইসলাম, রাশেদুল আলম, আশিকুর রহমান, স্ট্রেচার বেয়ারার আলী হোসেন এবং ডোম মো. লিটনের একটি চক্র কাজ করে এখানে। এ চক্রের অনিয়মের শুরু হয় ট্রলি দিয়ে। জরুরি বিভাগে কোনো রোগী এসে টাকা ছাড়া ট্রলি-হুইল চেয়ার পান না। ট্রলি নিয়ে লুকিয়ে রাখা হয় মর্গে। টাকা দিলে এনে দেওয়া হয়। কোনো রোগীর ভর্তি প্রয়োজন হলেও ৫০০-১০০০ টাকা না দিলে ভর্তি হতে পারেন না। বেশি খারাপ রোগী হলে বা সহজ সরল মানুষ হলে ‘রোগীর অবস্থা খারাপ, আইসিইউ লাগবে’- এমন ভয়-ভীতি দেখিয়ে পাঠিয়ে দেয় বেসরকারি ক্লিনিকে। সেখান থেকে পায় মোটা অংকের কমিশন।
















